মুক্তির কণ্ঠ
অপরাধ

নবজাতক ছেলে শিশুর মা আছে, কিন্তু নেই বাবার পরিচয়।

ইঞ্জিনিয়ার মোঃ আজহার উদ্দিন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে: নবজাতক ছেলে শিশুর মা আছে, কিন্তু নেই বাবার পরিচয়। তারপরও মায়ের কোলেই ঠাঁই হলো তার। অনিশ্চয়তা আর সংগ্রামে ভরা সেই পুরোনো আশ্রয়স্থল আখাউড়া রেলস্টেশনের ১ নম্বর প্লাটফর্মের ওভারব্রিজের নিচে। Brahmanbaria Batighar ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর

A
admin@muktirkantho.com
22 ঘণ্টা আগে
📍 ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সরাইল
নবজাতক ছেলে শিশুর মা আছে, কিন্তু নেই বাবার পরিচয়।
মুক্তির কণ্ঠmuktirkantho.com

ইঞ্জিনিয়ার মোঃ আজহার উদ্দিন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে:
নবজাতক ছেলে শিশুর মা আছে, কিন্তু নেই বাবার পরিচয়। তারপরও মায়ের কোলেই ঠাঁই হলো তার। অনিশ্চয়তা আর সংগ্রামে ভরা সেই পুরোনো আশ্রয়স্থল আখাউড়া রেলস্টেশনের ১ নম্বর প্লাটফর্মের ওভারব্রিজের নিচে।

Brahmanbaria Batighar - ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর-এর উদ্যোগে সোমবার (২৫ মে) বিকেল ৫টার দিককে নবজাতক ছেলে সন্তানকে বুকে জড়িয়ে সেখানে ফিরে যান অসহায় মা মাহমুদা আক্তার রুপা (২০)। যে জায়গায় একসময় ভাসমান জীবন কাটাতেন তিনি, সেখানেই এখন শুরু হলো তার নবজাতক ছেলে শিশুর জীবনযুদ্ধ।

রুপা ও তার সন্তানকে আখাউড়া রেলস্টেশনে পৌঁছে দেওয়ার আগে বিষয়টি অবগত করা হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. রতন কুমার ঢালী, সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শহীদুল ইসলাম, আখাউড়া রেলওয়ে থানার (ওসি) এস এম শফিকুল ইসলাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলওয়ে ফাঁড়ির ইনচার্জ উপ-পরিদর্শক (এসআই) শাহ আলমকে৷

বিদায়ের সময় ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের পক্ষ থেকে নবজাতকের জন্য ৫ সেট জামা-প্যান্ট, ৫ সেট গেঞ্জি-প্যান্ট, ৫ সেট সেন্টু গেঞ্জি, একটি বেডশিট, বালিশ, কুল-বালিশ, একটি বড় প্যাম্পার্স, একটি ভেজা টিস্যুর বক্স, দুইটি তোয়ালে, একটি মশারি ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী প্রদান করা হয়। এছাড়াও রুপাকে দেওয়া হয় দুই সেট নতুন কাপড় ও প্রয়োজনীয় সহায়তা। হাসপাতাল থেকে তার ৭০ শতাংশ ওষুধ সরবরাহ করা হয় এবং বাকি ওষুধ কিনে দেয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর। ভবিষ্যতেও রুপা ও তার সন্তানকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।

তবুও শত কষ্টের মাঝেও নিজের সন্তানকে কারও হাতে তুলে দিতে রাজি নন রুপা। প্রতারণা, অবহেলা আর অনিশ্চয়তার অন্ধকারে থেকেও তিনি স্বপ্ন দেখেন, একদিন তার সন্তান মানুষের মতো মানুষ হবে। বিয়ের প্রলোভনে পড়ে সাব্বির নামের এক যুবকের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে অন্তঃসত্ত্বা হন রুপা। কিন্তু গর্ভধারণের পরই বদলে যায় সবকিছু। অভিযোগ রয়েছে, সন্তানকে নিজের বলে স্বীকার না করে রুপাকে ছেড়ে চলে যান সাব্বির। সমাজের নির্মম বাস্তবতায় তখন একা হয়ে পড়েন এই তরুণী।

মানবতার সবচেয়ে সুন্দর দৃষ্টান্তটি দেখা যায় সেই কঠিন সময়েই। গত বৃহস্পতিবার (২১ মে) রাত থেকে প্রসববেদনায় কাতর রুপাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের গাইনি বিভাগে ভর্তি করা হয়। গভীর রাতজুড়ে অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকা অসহায় এই মায়ের পাশে দাঁড়ান হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর। নিজের দায়িত্বের বাইরে গিয়েও তারা নিশ্চিত করেছেন রুপার চিকিৎসা, ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও খাবারের ব্যবস্থা।।পরিস্থিতির অবনতি হলে গত শুক্রবার (২২ মে) ভোররাত ৩টার দিকে জরুরি সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে রুপা জন্ম দেন একটি সুস্থ ছেলে সন্তানের। অপারেশন পরিচালনা করেন গাইনি কনসালটেন্ট ডা. কামরুন্নাহার বেগম এবং অ্যানেসথেসিয়ার দায়িত্বে ছিলেন ডা. হাবিবুর রহমান শামীম। হাসপাতালের নার্স ও অপারেশন থিয়েটারের স্টাফদের আন্তরিক সহযোগিতায় নিরাপদে পৃথিবীর আলো দেখে নবজাতক শিশুটি। সিজারের পর মা ও সন্তান দু’জনই সুস্থ ছিলেন।

রুপার জন্ম কুমিল্লার বরুড়া উপজেলায় হলেও ছোটবেলা থেকেই তার বেড়ে ওঠা আখাউড়া রেলস্টেশন এলাকায় ভবঘুরে জীবন কাটিয়ে। সেখানেই পরিচয় হয় সাব্বিরের সঙ্গে। প্রেম, বিয়ের স্বপ্ন আর বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে একসময় তাকে একা ফেলে চলে যাওয়া হয়। অথচ অনাগত সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখতে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করেছেন রুপা।

অভিযোগ রয়েছে, চিকিৎসার জন্য আখাউড়া রেলস্টেশন কিছু মানুষ যে টাকা তুলে দিয়েছিলেন, তা-ও আত্মসাৎ করে একজন নারী রুপাকে হাসপাতালে রেখেই চলে যান। কিন্তু মানবতা হারিয়ে যায়নি। চিকিৎসক, নার্স, পুলিশ প্রশাসন ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের মানবিক সহায়তায় সঠিক চিকিৎসা ও সেবাযত্ন পেয়েছেন রুপা। তাদের আন্তরিকতা না থাকলে হয়তো মা ও নবজাতকের জীবন আরও বড় ঝুঁকির মুখে পড়তে পারত।

আজ নবজাতক শিশুটির পরিচয়ে বাবার নাম নেই, আছে শুধু মায়ের ভালোবাসা আর সংগ্রামের ইতিহাস। সমাজের অবহেলা, প্রতারণা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে এক অসহায় মা প্রমাণ করে দিয়েছেন মাতৃত্ব কখনও পরাজিত হয় না। আর মানবিক মানুষগুলো এখনো আছেন বলেই পৃথিবীটা পুরোপুরি নিষ্ঠুর হয়ে যায়নি।

মন্তব্য বিভাগটি শীঘ্রই চালু হবে।

বিজ্ঞাপন